স্থানীয় খবর

করোনা:বগুড়ার টুপি পল্লীর ২ লাখ নারী চরম সংকটে

Spread the love

আজকের শেরপুর ডেস্ক: করোনার প্রভাবে আর্থিক সংকটে পড়েছেন বগুড়ায় টুপি তৈরিতে নিয়োজিত জেলার শেরপুর ও ধুনট উপজেলার গৃহবধু ও তাদের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া যুবতী ও কিশোরী কন্যাসহ ২ লাখ নারী। প্রতি বছর রমজান মৌসুমে টুপির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে বলে এর উৎপাদনও বেড়ে যায়। কিন্তু এবার করোনাভাইরাস সৃষ্ট মহামারীর কারণে উৎপাদিত টুুপির চাহিদা না থাকায় বিপুল সংখ্যক নারী ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
টুপি তৈরিতে নিয়োজিত নারীরা জনিয়েছেন, পাইকারী ব্যবসায়ীরা টুপি না কেনায় ঈদের আগে তারা অন্তত ১০ হাজার টাকা থেকে পনের হাজার টাকা আয় থেকে বঞ্চিত। এতে শুধু ঈদের কেনা-কাটা করা যেমন অসম্ভব হয়ে পড়েছে তেমনি আগামীতে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার খরচ বহন করাও কষ্টসাধ্য হবে। তারা অবিলম্বে সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
টুপির পাইকারি ক্রেতারা জানান, করোনা পরিস্থিতির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বড় বড় শহরের সিংহভাগ মার্কেটগুলোতে আগের মত স্বাভাবিক কেনা-কাটা হচ্ছে না। এর পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানী বন্ধ রয়েছে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই তারা নারীদের উৎপাদিত টুপি কেনা বন্ধ রেখেছেন।
প্রায় চার দশক আগে বগুড়ার ধুনট উপজেলার নিমগাছি গ্রামে কয়েকজন গৃহবধু কুরুশকাঁটা দিয়ে টুপি তৈরি শুরু করেন। প্রথম দিকে এই টুপিগুলো বাড়ির পুরুষ সদস্যরা ব্যবহার করলেও পরবর্তীতে গেল শতাব্দীর নব্বই দশকের শুরুতে তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি শুরু হয়। এতে গৃহবধুরা বাড়তি আয়ের জন্য টুপি তৈরি শিখে তার উৎপাদন বাড়িয়ে দেন। এক পর্যায়ে ধুনট উপজেলার সীমানা ছাড়িয়ে তা পাশের শেরপুর উপজেলার গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। গৃহবধুদের পাশাপাশি তাদের স্কুল-কলেজ পড়–য়া যুবতী ও কিশোরী মেয়েরাও টুপি তৈরিতে মনোযোগী হন। বাড়ি বাড়ি সব বয়সী নারী টুপি তৈরিতে যুক্ত হওয়ায় ওই দুই উপজেলার গ্রামগুলো টুপি পল্লী হিসেবে পরিচিত পেয়েছে।
বগুড়ায় নারীদের উৎপাদিত টুপি পাইকারি বিক্রেতাদের সংগঠন বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বগুড়ার ধুটন ও শেরপুর উপজেলায় গৃহবধু এবং তাদের স্কুল-কলেজ পড়ুয়া মেয়েসহ প্রায় ২ লাখ নারী টুপি তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করেন। সারা বছর উৎপাদিত টুুপি রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাশাপাশি ভারত, পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিক্রি হয়। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে চাহিদা বেড়ে যায় বলেই রমজানে অন্তত ১ কোটি পিস টুপি উৎপাদন হয়। মান ভেদে এসব টুপি ৩০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১৫০ টাকায় বিক্রি হয়।
ধুনট উপজেলার পেঁচিবাড়ি গ্রামের গৃহবধু স্বর্ণা খাতুন জানান, তার স্বামী পেশায় দিনমজুর। তার একার আয়ে সংসার চলে না বলে তিনি টুপি তৈরি করে প্রতি মাসে গড়ে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা আয় করেন। তবে রমজানে বেশি চাহিদা থাকে বলে শব-ই বরাতের পর থেকে পরবর্তী এক মাসে দ্বিগুণ বেশি উৎপাদন করে বলে আয়ও বেড়ে ১২ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা হয়। শেরপুর উপজেলার শালফা এলাকার আয়েশা সিদ্দিক নামে এক কলেজ ছাত্রী জানান, কলেজ বন্ধ থাকলেই তিনি বাড়ি এসে টুপি তৈরি করে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। যা দিয়ে তার পড়ালেখার খরচ চলে। তিনি বলেন, ‘এবার করোনার কারণে ১৯ মার্চ থেকে কলেজ বন্ধ হওয়ার পর বাড়ি এসে টুপি তৈরি শুরু করি। শব-ইব বরাতের পর তা আরও বাড়িয়ে দিই। ভেবেছিলাম এবার উৎপাদন বেশি হচ্ছে টাকাও বেশি পাব। কিন্তু করোনার কারণে পাইকারি ক্রেতারা গ্রামে আসছেন না এবং টুপি কেনাও বন্ধ রেখেছেন। তাই আমাদের ঈদের কেনা-কাটা যেমন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছি তেমনি আগামীতে পড়ালেখার খরচ যোগানও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখন সরকার যদি সাহায্য না করে তাহলে আমরা আমাদের মায়েরা কিভাবে চলবে।’
বগুড়ায় টুপি পাইকারি বিক্রেতাদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ জালি টুপি অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি জুয়েল আখন্দ জানান, করোনার কারণে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আগে থেকেই ঘরে থাকায় এবার জেলার ধুনট ও শেরপুরের গ্রামের ঘরে ঘরে টুপির উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু করোনা সৃষ্ট মহামারির কারণে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বড় বড় জেলার সিংহভাগ মার্কেট ও বিপনী বিতান বন্ধ থাকায় টুপির চাহিদা নেই। পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানী বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া এবার বিক্রি এতটাই কমেছে যে আগের বছরের মজুদই শেষ হচ্ছে না। তাই নতুন করে কেনা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমরা নারীদেও উৎপাদিত টুপিগুলো কিনতে চাই। কিন্তু যেহেতু বেচা-কেনা নেই সে কারণে পুঁজিরও সংকট রয়েছে। তবে সরকার যদি আমাদের প্রণোদনা দেয় তাহলে আমরা হয়াতো নারীদের কাছ থেকে উৎপাদিত টুপি কিনে নিতে পারতাম।’

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Close