দেশের খবর

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আমার প্রথম দেখা

Spread the love

“মুনসী সাইফুল বারী ডাবলু”
স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সঙ্গে বিদেশে থাকায় শেখ হাসিনা ও তাঁর আপন বলতে একমাত্র ছোট বোন শেখ রেহানা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম হত্যকান্ড থেকে প্রাণে বেঁচে যান। ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়ার জার্মান ভিসার মেয়াদ শেষ হলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর আতিথেয়তায় পরবাসী জীবন কাটান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। সামরিক শাসক জিয়া শেখ হাসিনার দেশে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর বাড়ীটি বন্ধ করে রাখে।
১৯৮১ সালে ফেব্রুয়ারির ১৪, ১৫ ও ১৬ তারিখে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী করা হলে ঐ বছরেরই ১৭ মে তারিখে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তিনি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এদিন বিকেল সাড়ে ৪ টায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের বোয়িং বিমানে তিনি ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে কলকাতা হয়ে তৎকালীন ঢাকা কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছান। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বর ধানমন্ডীর বাড়ীতে তখন শেখ হাসিনাকে উঠতে দেয়া হয়নি।
১৯৮১ সালে রোজার মাস, দিন তারিখ ঠিক মনে নেই। আমি তখন ঢাকায় আমার সেজো বোন মোছা: কামরুন নাহারের বাসায় বেড়াতে গিয়েছি। ভগ্নিপতি বদিউল হক তার ছোট ভাই হাবিবুল হক ও নকিবুল হক সরকারী চাকরী করায় ঢাকায় ৯০ নম্বর শুক্রাবাদে থাকতেন। ভগ্নিপতি বদিউল হকের আপন চাচাতো ভাই সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদুত কবি সানাউল হক থাকতেন ধানমন্ডীতে। ১৯৮১ সালে রোজার মাসে কোন একদিন ধানমন্ডীতে কবি সানাউল হকের বাসায় যাওয়ার জন্য ৯০ নম্বর শুক্রাবাদ থেকে মেইন রোডে যখন এসেছি তখন কাকতালিও ভাবে আমার বাল্যবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র একেএম আছাদুজ্জামান ও আমাদের এলাকার এক প্রাইমারী স্কুল শিক্ষক ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা তোমেজ উদ্দিনের সাথে দেখা হয়। এ সময় মুক্তিযোদ্ধা তোমেজ উদ্দিন ধানমন্ডী ৩২ নম্বরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ীটি দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে বললেন দুর থেকে হলেও আমরা যেন তাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ীটি দেখাই। তার কথায় রাজি হয়ে আমরা হেঁটে হেঁটে ৩২ নম্বরের দিকে রওনা হলাম। ৩২ নম্বরে গিয়ে দেখি বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর মেইন গেট খোলা। বেশ কয়েকজন পাহাড়াদার থাকলেও আমরা বিনাবাধায় ভীতরে প্রবেশ করি। এরপর বাসার নিচতলায় বেশ বড় একটি রুমে জাতির জনকের কন্যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নব নির্বাচিত সভানেত্রী স্বজনহারা শেখ হাসিনা ২০/২২ জন সিনিয়র নেতাদের সাথে নিয়ে মনে হয় বৈঠক করছিলেন। আমরা হলরুমের দরজায় উঁকি দিতেই স্বজনহারা শেখ হাসিনা আমাদেরকে ইশারা দিলেন তার কাছে যাওয়ার জন্য। আমরা কাছে যেতেই পাশের সোফা থেকে লোক উঠিয়ে দিয়ে আমাদেরকে বসতে বললেন এবং আমাদের পরিচয় জানতে চাইলেন। আমরা পরিচয় দিয়ে বললাম আমি বগুড়ার শেরপুর থানায় আওয়ামী যুবলীগের একজন ক্ষুদ্র কর্মী, একেএম আছাদুজ্জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং মুক্তিযোদ্ধা তোমেজ উদ্দিনকে দেখিয়ে বললাম উনি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর অন্ধভক্ত। উনি বঙ্গবন্ধুর এই বাড়ীটি দেখতে আগ্রহী। এই কথা বলার পর জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর কন্যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নব নির্বাচিত সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কলিংবেল টিপলেন এবং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একগোছা চাবি বের করে মধ্যবয়সী এক লোকের (সম্ভবত বাড়ীর কেয়ারটেকার) হাতে দিয়ে বাড়ীটি আমাদেরকে ঘুরে ফিরে দেখাতে বললেন। আমরা যখন বাড়ীটি ঘুরে ফিরে দেখছিলাম তখন বৈঠকে উপস্থিত অনেকেই আমাদের সাথে অংশগ্রহন করেন। সে এক আবেগঘন পরিবেশ। মধ্যবয়সী লোকটি বর্ননা করছিলেন কোথায় জাতির জনকের লাশ পড়েছিলো, কোথায় বেগম ফজিলতননেছা মুজিবকে হত্যা করা হয়েছিল,কোথায় শেখ কামাল, শেখ জামাল,শিশু শেখ রাছেলকে কিভাবে হত্যা করা হয়েছিল এ সব শুনে অনেকেই সেদিন হাউ মাউ করে কেঁদেছেন। অনেক জায়গায় ছোপছোপ রক্তের দাগ ও খুনিদের বুলেটের চিহ্ন দৃশ্যমান ছিল। আমরা বাড়ীটি ঘুরে ফিরে দেখে নিচে নেমে এসে যখন সভানেত্রী শেখ হাসিনার সাথে আবার দেখা করলাম তখন তিনি বললেন রোজার দিন তোমরা সবাই বিকালে এসে আমার এখানে ইফতার করে যাবে। কিন্তু সেদিন আর ইফতার করার সুযোগ হয়নি জরুরী কাজ থাকায় ঐদিন বিকালেই বগুড়ার পথে রওয়ানা হই। যদিও পরে বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি আলহাজ্ব মজিবর রহমান মজনু’র সাথে অনেকবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার বাসায় (সুধাসদন) এমনকি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যাওয়া এবং খাওয়ার সুযোগ হয়েছে।
এটাই ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে আমার প্রথম দেখা। এরপর ১৯৮৮ সালে ভয়বহ বন্যার মধ্যে আওয়ামী লীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা উত্তরাঞ্চল সফরে এলে শেরপুর উপজেলার শেরপুর-ধুনট রোডের সুবলিতে এক বিশাল জনসভার মঞ্চে উপজেলা আওয়ামী যুবলীগের সাধারন সম্পাদক হিসাবে খুব কাছে থেকে তার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৯১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার অভিযানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা উত্তরাঞ্চল সফরে এলে শেরপুর উপজেলার মির্জাপুরে অনুষ্ঠিত মরহুম ফেরদৌস জামান মুকুলের বিশাল নির্বাচনী জনসভার মঞ্চে এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের একজন ক্ষুদ্র কর্মী এবং একজন গনমাধ্যম কর্মী হিসাবে শেরপুরে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন জনসভা ও পথসভার মঞ্চে কথা বলার সুযোগ হয়েছে।
২০০০ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বগুড়া প্রেসক্লাবের সভাপতি মোজাম্মেল হক লালু ও সাধারন সম্পাদক মাহমুদুল আলম নয়নের নেতৃত্বে বগুড়ার একদল সাংবাদিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী (বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রথম মেয়াদে) জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করার জন্য তেজগাঁওস্থ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গমন করি। ঐ সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসাবে আমারও সেখানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিলো। সেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে বগুড়া প্রেসক্লাবের জায়গা বরাদ্দ সহ প্রেসক্লাবের উন্নয়ন নিয়ে মত বিনিময় হয়। ঐ মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রচার সম্পাদক বগুড়ার কৃতি সন্তান কৃষিবিদ আব্দুল মান্নান, বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি আলহাজ্ব মমতাজ উদ্দিন ও তৎকালীন সাধারন সম্পাদক ফেরদৌস জামান মুকুল উপস্থিত ছিলেন। জননেতা কৃষিবিদ আব্দুল মান্নান কিছু বলতেই সাংবাদিকবান্ধব প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন আজ কোন বক্তব্য হবেনা আজ আমি সাংবাদিকদের সাথে গল্প করবো। বগুড়া প্রেসক্লাবের উন্নয়ন সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খুবই আন্তরিক পরিবেশে প্রায় ২ ঘন্টা গল্প করার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের বললেন পাশের রুমে টেবিলে খাবার দেওয়া আছে সবাই খেয়ে যাবেন,কেউ না খেয়ে যেতে পারবেন না। তার আতিথেয়তা সত্যই আমাদের সবাইকে মুগ্ধ করেছিল।
২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে সুধাসদনে জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে আমি সহ শেরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি আমাদের কথা ধর্য্য সহকারে শোনেন এবং দলের মনোনিত এমপি প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন। ২০০৯ সালে ২য় মেয়াদে সরকার গঠন করার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একাধিক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের একজন ক্ষুদ্র কর্মী এবং গনমাধ্যম কর্মী হিসাবে যোগদান করার সুযোগ হলেও কাছে গিয়ে কথা বলার আর সুযোগ হয়নি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Close