খেলাধুলা

বিশ্বকাপে প্রথম পাকিস্তানকে হারানোর ২১ বছর পূর্তি

Spread the love

আজকের শেরপুর ডেস্ক: বাংলাদেশের ক্রিকেট টেস্ট স্ট্যাটাস পায় ২০০০ সালে। এরআগে কখনও কখনও কোন দলের বিপক্ষে জয় পেলেও তা ছিলো হাতেগোনা। মাঝে মাঝে জয় পেলেও ২০১৫ সালের আগে কখনোই সেভাবে সমীহ করার মতো দল হয়ে ওঠেনি টাইগাররা।
স্বাভাবিকভাবেই টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার আগে বাংলাদেশকে সেভাবে কেউ গোণায় ধরেনি। তার ওপর ১৯৯৯ সালে প্রথমবারের মতো ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করে টাইগাররা। ফলে বড় দলগুলোর বিপক্ষে বাংলাদেশের অসহায় আত্মসমর্পণের দৃশ্যই সবার কাছে স্বাভাবিক ছিল।
তবে এই বিশ্বকাপেই একটি ম্যাচে বড় অঘটন ঘটিয়ে ফেলে লাল সবুজের প্রতিনিধিরা। বলা যায় এই ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে নিজেদের নতুন করে চেনায় বাংলাদেশ। আজ থেকে ঠিক ২১ বছর আগে ১৯৯৯ সালের ৩১ মে হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ, যার পর সেই বিশ্বকাপে খেলা টাইগার ক্রিকেটাররা হয়ে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় তারকা।

আলোচ্য বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচে মাঠে নেমেছিল বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। দুই দলের কারোরই এই ম্যাচ থেকে প্রমাণ করার কিছু ছিলো না। বলতে গেলে উভয় দলের জন্য এটি ছিলো নিয়মরক্ষার একটি ম্যাচ। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হওয়ার আগে পাকিস্তান ছিল টেবিল টপার। তাই প্রথমবার আসা বাংলাদেশকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি তারা।
টস জিতে বাংলাদেশকে আগে ব্যাট করতে পাঠান পাকিস্তানের অধিনায়ক ওয়াসিম আকরাম। উদ্দেশ্য খুবই সহজ, দ্রুত অল আউট করে তাড়াতাড়ি রান তাড়া করে আগে ভাগে ম্যাচটা শেষ করা। যেহেতু সুপার সিক্স এরইমধ্যে নিশ্চিত তাই পুঁচকে বাংলাদেশের সঙ্গে বেশি সময় নষ্ট করতে চাননি তিনি।
বাংলাদেশের হয়ে ইনিংস উদ্বোধন করতে নামেন শাহরিয়ার হোসেন বিদ্যুৎ ও মেহরাব হোসেন অপি। ওয়াকার ইউনিসের করা ইনিংসের প্রথম ওভারটি দেখেশুনে খেলে মেইডেন দেন বিদ্যুৎ। রাওয়ালপিন্ডি এক্সপ্রেসখ্যাত শোয়েব আখতারের করা পরের ওভার থেকে ২ রান নেন অপি। তৃতীয় ওভারের তৃতীয় ও পঞ্চম বলে দু’টি চার মারার পর খোলসে ঢুকে যান বাংলাদেশী দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান। একেরপর এক সিঙ্গেল নিয়ে ইনিংস এগিয়ে নিতে থাকেন তারা। প্রথম ১০ ওভারে শেষে কোনো উইকেট না হারিয়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৩১ রান।
এই দুজনের বিদায়ের পর নাইমুর রহমান দুর্জয় ও আকরাম খান মিলে দলকে এগিয়ে নিতে থাকেন। ব্যাটসম্যানদের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে এক পর্যায়ে বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৫ উইকেট হারিয়ে ১৫০ রান। এমতাবস্থায় মিনহাজুল আবেদীন নান্নু ও খালেদ মাহমুদ সুজনের জুটির সুবাদে নির্ধারিত ৫০ ওভার শেষে ৯ উইকেট হারিয়ে ২২৩ রান করে টাইগাররা। পাকিস্তানের সাকলাইন মুশতাক ৩৫ রান দিয়ে শিকার করেন ৫ উইকেট।
সাঈদ আনোয়ার ও শহিদ আফ্রিদি পাকিস্তানের ইনিংস উদ্বোধন করতে নামেন। বাংলাদেশের পক্ষে বোলিং আক্রমণের সূচনা করেন খালেদ মাহমুদ সুজন। দলের হয়ে প্রথম আঘাত হানেন তিনিই। প্রথম ওভারের পঞ্চম বলটি ফ্লিক করতে চেয়েছিলেন আফ্রিদি। কিন্তু সুজনের বল বুঝতে পারেননি তিনি। ব্যাটে লেগে বল সোজা চলে যায় অপির হাতে।
শফিউদ্দিন আহমেদের করা পরের ওভারে ফের পাকিস্তান দুর্গে পতন। অফ-স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে ইনসাইড এজ হয়ে সাজঘরে ফেরেন ইজাজ। মাত্র ৭ রানে ২ উইকেট হারায় পাকিস্তান। তখনই মনে হয়, আজ কি কিছু হতে যাচ্ছে?
এমতাবস্থায় প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানকে আরো চেপে ধরা। টাইগার ক্যাপ্টেন আমিনুল ইসলাম বুলবুল করলেনও তাই। অষ্টম ওভারে আসে তৃতীয় সাফল্য। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের মেরুদন্ড বলে পরিচিত সাইদ আনোয়ারকে রান আউট করেন খালেদ মাসুদ পাইলট। তাদের সংগ্রহ তখন ২৬/৩।
পরের ওভারেই আউট হন ইনজামাম উল হক। দ্রুতই সেলিম মালিক তার পথ অনুসরণ করলে পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডের চেহারা দাঁড়ায় ৫ উইকেটে মাত্র ৪২ রান। এরপর দলের হাল ধরার চেষ্টা করেন ওয়াসিম আকরাম ও আজহার মেহমুদ। লোয়ার অর্ডারের আপ্রাণ চেষ্টার মাধ্যমে এই জুটি ষষ্ঠ উইকেটে যোগ করেন মোট ৫৫ রান। তবে এরপর ৫ রানের ব্যবধানে দুজনকেই আউট করেন নান্নু।
উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান মঈন খান যখন আউট হন তখন পাকিস্তানের প্রয়োজন আরো ১০৪ রান। ম্যাচ বলতে গেলে বাংলাদেশের হাতের মুঠোয়। তবে সাকলাইন মুশতাক ও ওয়াকার ইউনিস এত সহজে হাল ছাড়ার পাত্র নন। দেখেশুনে ৮টি ওভার পার করেন দুজন। ৪৩ ওভারে নবম উইকেটের পতনের পর শুরু হয় মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা।
শেষ পর্যন্ত ৪৫তম ওভারে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। দুর্জয়ের বল ড্রাইভ করে শোয়েব আখতার ওপারে পৌঁছালেও সময়মতো ক্রিজে পৌঁছতে পারলেন না সাকলাইন। খালেদ মাসুদ পাইলট স্ট্যাম্প ভাঙ্গার সঙ্গে সঙ্গে যেন ভেঙ্গে দিলেন পাকিস্তানের দর্প। তদেরকে ১৬১ রানে অল আউট করে দিয়ে ৬২ রানের বড় ব্যবধানে জিতে যায় বাংলাদেশ। একইসঙ্গে বাঁধভাঙা আনন্দে মাতেন দেশবাসী।

এই জয়ে প্রথমবারের মতো কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশকে একদিনের ম্যাচে ধরাশায়ী করে বাংলাদেশ। অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচ সেরার খেতাব জিতে নেন খালেদ মাহমুদ সুজন।
সে সময়ের মহাপরাক্রমশালী পাকিস্তানকে রীতিমতো তুলোধুনো করে হারানো ম্যাচটি পরবর্তীতে বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাস প্রাপ্তির ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়ে দিয়েছিল বলে মনে করেন অনেক ক্রিকেটবোদ্ধা। অবিস্মরণীয় এই ম্যাচটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সেরা ম্যাচ। ২১ বছর আগের আজকের এই দিনেই রচিত হয়েছিল অমর সেই কীর্তিগাঁথা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Close