দেশের খবর

অঢেল সম্পত্তির মালিক কাউন্সিলর মিজান রিমান্ডে

Spread the love

শেরপুর ডেস্ক: দরিদ্র পরিবারের সন্তান হাবিবুর রহমান মিজান সত্তরের দশকে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়েই ঝালকাঠির নলছিটি থেকে শূন্যহাতে ঢাকায় এসেছিলেন। এরপর মিরপুরে হোটেল বয় হিসেবে কাজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে চলে আসেন মোহাম্মদপুরে। শুরু করেন রাস্তায় ম্যানহোলের ঢাকনা চুরির কাজ। হাত পাকিয়ে নামেন ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে। ততদিনে সাঙ্গোপাঙ্গও হয় তার। এক পর্যায়ে বাহিনী গঠন করে খুন-চাঁদাবাজিতেও জড়ান। রাজনীতির নানা ঘাটে ভিড়ে ওয়ার্ড কাউন্সিলরের মতো জনপ্রতিনিধি হন, দলীয় পদ পেয়ে নেতাও হন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তার। দখল-চাঁদাবাজিতে মোহাম্মদপুর এলাকায় এক ত্রাসের ‘সাম্রাজ্য’ গড়ে তোলেন তিনি। একসময়ের হোটেলবয় হয়ে যান বহু বিত্তবৈভবের মালিক। মতাধর সেই মিজান র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়ে সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন এখন।
চলমান ‘শুদ্ধি’ অভিযানের মধ্যে প্রতিবেশী দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান। গত শুক্রবার ভোরে র‌্যাব-২-এর একটি দল তাকে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসে। এরপর রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আওরঙ্গজেব রোডে তার বাসায় অভিযান চালিয়ে ছয় কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক ও এক কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কাগজ জব্দ করা হয়। ওই ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় মানি লন্ডারিং আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। মামলাটির তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ বিভাগ-সিআইডি।
র‌্যাব-২০এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানিয়েছেন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া তাকে গ্রেফতারের সময় দুই লাখ টাকা, গুলি সহ একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায়ও শ্রীমঙ্গল থানায় তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এদিকে মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক গিয়াস উদ্দিন জানান, শনিবার মিজানকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে অর্থ পাচার ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হবে।
স্থানীয় লোকজন ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, হাবিবুর রহমান মিজানের নাম এক সময় মিজানুর রহমান ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের দিকে ছিনতাই মামলায় পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে যায়। ওই সময়ে দৌড়ে তিনি পুকুরে ঝাঁপ দেন। অন্তত চার ঘণ্টা পর পুকুর থেকে জামা-কাপড় ছাড়া উঠে আসেন। এর পর থেকেই লোকজনের কাছে তিনি ‘পাগলা মিজান’ নামে পরিচিতি পান। তবে অর্থ-বিত্তের মালিক হয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন হাবিবুর রহমান মিজান।
মোহাম্মদপুরের বিভিন্ন লোকজন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, মোহাম্মদপুরজুড়ে কাউন্সিলর মিজান নামে-বেনামে সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন। মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, দখলসহ নানা অপরাধ থেকে কমিশন নিয়ে তিনি এসব সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। তিনি মোহাম্মদপুরের বছিলা রোডের তিন রাস্তা মোড়ে হাবিব প্লাজার মালিক, ওই ভবনের পেছনে খ্রিষ্টানদের জায়গা দখল করে রেখেছেন, আওরঙ্গজেব রোডে একটি ভবনের চারতলাজুড়ে রয়েছে ফ্যাট, জাকির হোসেন রোডে রয়েছে পাঁচ ফ্যাট।
অবশ্য র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাবিবুর রহমান মিজানের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই। একটি ইটের ভাটা থাকলেও ১৫ বছর আগে সেই ব্যবসা বাদ দেন। এর পরও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এত সম্পদের মালিক হওয়ার রহস্য জানতে চাইলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। দেশের বাইরে অস্ট্রেলিয়া, লন্ডন ও আমেরিকার তার বাড়ি-গাড়ি থাকার তথ্য রয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা এসব অনুসন্ধান করবেন।

মিজানের উত্থান যেভাবে: মোহাম্মদপুরের স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, ‘৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসী মিজান জাসদের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েন। এক পর্যায়ে সেখান থেকে বিতাড়িত হয়ে ফ্রিডম পার্টিতে চলে যান। ১৯৭৬ সালে ফ্রিডম পার্টির প থেকে মিজান, শামীম জালালী, বাবুল ওরফে পিচ্চি বাবুল সহ কয়েকজন লিবিয়া যান গেরিলা ট্রেনিংয়ের জন্য। এক পর্যায়ে মিজান ফ্রিডম পার্টির ধানমন্ডী -মোহাম্মদপুর জোনের কো-অর্ডিনেটরের দায়িত্ব পান। তার সঙ্গে তার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফাও ফ্রিডম পার্টিতে ছিলেন। ওই গ্রুপটিই ১৯৮৯ সালে ধানন্ডীর ৩২ নম্বরে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলার চেষ্টা চালায়। এরপর বেশ কয়েক বছর রাজনীতিতে নিক্রিয় থাকেন। নব্বইয়ের দশকে তার আবার আবির্ভাব ঘটে। ভোল পাল্টে ও নিজের নাম পাল্টে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯৪ সালে তিনি তৎকালীন ৪৫ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনারও হন। ১৯৯৫ সালের দিকে মিজানের ভাই মোস্তফা সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হলে ফের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে সক্রিয় হন। মোহাম্মদপুর এলাকায় মতাসীন দলের পদ পেয়ে হন অঢেল সম্পত্তির মালিক।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close