দেশের খবর

রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি থেকেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা

Spread the love


ঝর্ণা মনি: মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার একসময় বলেছিলেন, আমেরিকার বাইরে তার তিনজন শত্রু রয়েছেন। একজন শেখ মুজিবুর রহমান ও বাকি দুজন হলেন চিলির রাষ্ট্রপতি সালবাদোর আলেন্দে ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রনায়ক নগুয়েন ভ্যান থিউ। যে কোনোভাবে তাদের উৎখাত করা ছিল তার রাজনৈতিক লক্ষ্য। এই তিনজনের মধ্যে শেখ মুজিবের প্রতি তিনি সর্বাধিক অসন্তুষ্ট ছিলেন, কারণ শেখ মুজিবের কারণেই ১৯৭১ সালে পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, যার ফলে তিনি পাকিস্তানের সহায়তায় চীন-আমেরিকা সুসম্পর্ক তৈরির যে পরিকল্পনা করেছিলেন তা চরমভাবে বিঘ্নিত হয়। শুধু তাই নয়, শেখ মুজিবের কারণে আমেরিকার ওই সময়ের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক ছিল, যা ছিল আমেরিকার জন্য নেতিবাচক। তাই যে কোনো মূল্যে তিনি মুজিবকে উৎখাত করতে এবং বাংলাদেশে নিজেদের অনুকূল শাসন প্রতিষ্ঠা করতে মনস্থ ছিলেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের বেসামরিক প্রশাসনকেন্দ্রিক রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো সামরিক ক্ষমতার প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঘটে। হত্যাকাণ্ডটি বাংলাদেশের আদর্শিক পটপরিবর্তন বলে বিবেচিত। বিশ্লেষকরা একমত, এটি নিছক হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এর পেছনে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। হত্যা মামলার রায়েও যেই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের কথা সংক্ষিপ্ত আকারে উল্লেখ রয়েছে। তবে ইতিহাসের নির্মম ওই হত্যাকাণ্ডের যে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল এবং তৎকালীন রাজনীতিকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি বিচারকাজ শেষ হওয়ার পরও অনেকটা অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
এ ব্যাপারে গবেষক ও রাজনৈতিক ধারা ভাষ্যকার মহিউদ্দিন আহমেদ ভোরের কাগজকে বলেন, হুট করে কয়েকজন মেজর এবং কিছু সোলজার মিলে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে- এটি বিশ্বাসযোগ্য নয়। বিষয়টা কখনো এরকম হতে পারে না যে, সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল হঠাৎ একজন এসে বলল, চলো আমরা ষড়যন্ত্র করে সরকারকে উৎখাত করে দিই। ঘটনা কখনো এভাবে ঘটে না। সবারই দায় আছে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে রাজনীতিকদের যোগসাজশের বিষয়ে যথেষ্ট গবেষণা বা তদন্ত হয়নি। হত্যা মামলার রায়ে ষড়যন্ত্রের কথা বলা হলেও এর পেছনে ঠিক কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল এবং রাজনীতিকরা ঠিক কিভাবে এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত তা মামলায় উঠে আসেনি। যদিও দলীয়ভাবে জাসদ হত্যাকাণ্ড ঘটাতে চেয়েছিল এমনটা মনে করেন না গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্র ন্যাপ ছাড়া সবাই বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছে। পনের আগস্টের ভিকটিম ছাড়া বাকিরা মোশতাক সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে। এমনকি মোশতাকের সরকারে শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার এবং বাকশালের অনেকেই যোগ দিয়েছে। জাসদ রাজনীতির জন্য বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করেছে। তবে কর্নেল তাহেরের ভ‚মিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তাহের বঙ্গবন্ধুকে উৎখাত করে জিয়াউর রহমানকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এদেশীয় কিছু সেনাসদস্য গোলাবিহীন ট্যাংক নিয়ে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করে বেতার-টেলিভিশন দখল করে জাতিকে হত্যার সংবাদ জানাবে- বিষয়টি মোটেই এত সরল নয়। বঙ্গবন্ধু ছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা। জাতির স্বার্থে, দেশের স্বার্থে বিন্দুমাত্র ছাড়ে অনড়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ একাত্তরে পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। একাত্তরের পাকিস্তানের পরাজয়ের সঙ্গে সমর্থনের কারণে মূলত. তাদেরও পরাজয় ঘটে। অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে তখন স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল। বিশ্ব রাজনীতি তখন টালমাটাল। আঞ্চলিক রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধু বিশাল ফ্যাক্টর ছিলেন। স্বভাবতই স্নাায়ুযুদ্ধের ভিকটিম হলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে উপমহাদেশের রাজনীতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেছন থেকে সেনাবাহিনীর উচ্ছৃঙ্খল সদস্যদের উসকে দিয়েছে। এছাড়া সর্বহারা পার্টি, ন্যাপ-ভাসানী, তোহা আব্দুল হক, টিপু বিশ্বাস, পশ্চিমবঙ্গের চারু মজুমদারের নকশাল পার্টি মনে করত মুজিব সরকার ভারতের পাপেট সরকার। ভাসানীর ‘হক কথা’য় মুজিব ও ভারতের বিরুদ্ধে লেখা হতো।
গবেষকদের মতে, মুজিব হত্যাকাণ্ডের দুটো ডাইমেনশন। একটা অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আরেকটি আন্তর্জাতিক। এর কোনোটাই বিচারে উঠে আসেনি। দেশের প্রচলিত আইনে আর দশটা হত্যাকাণ্ড যেভাবে হয়ে থাকে সেভাবেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ভোরের কাগজকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দুটি দিক রয়েছে। একটি পৈশাচিকতা, নির্মমতা, বর্বরতার দিক অন্যটি রাজনৈতিক দিক। বঙ্গবন্ধুকে খুন করে রাষ্ট্রের আত্মাকে খুন করতে চেয়েছিল খুনিরা। জাতিসত্তা, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত বাংলাদেশকে খুন করে। সামরিক শাসনের মাধ্যমের রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে ধূলিসাৎ করে দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়েছে। তবে বিচারে ষড়যন্ত্র উঠে আসেনি। (ভোরের কাগজের সৌজন্যে)

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close