ইতিহাস ও ঐতিহ্য

জীবনের গল্প ১৫

Spread the love

“মুনসী সাইফুল বারী ডাবলু”
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার সোহরাওয়ার্দ্দি উদ্দ্যানে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পনের মাধ্যমে বাংলাদেশ শত্রæমুক্ত হয়। ৩০ লাখ মানুষের রক্তের বিনিময়ে আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা,অর্জিত হয় নতুন দেশ নতুন পতাকা।
পাকিস্থানী সেনাবাহিনী আত্মসমর্পন করলেও তখনও জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্থানের কারাগারে বন্দী। মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষ বঙ্গবন্ধুর মুক্তির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্থানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বদেশের মাটিতে ফিরে এলেন। যুদ্ধ বিধ্বস্তদেশ,রাস্তাঘাট ছিলোনা,কলকারখানা বন্ধ। তখন সিরাজগঞ্জের কড্ডা গ্রামের আমার এক চাচা মরহুম মুনসী শামছুল হুদা সিদ্দিকী টোনা মিঞার বড় ছেলে মুনসী আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ওরফে মকবুল ভাই আমাদের ভাটরা গ্রামের বাড়িতে থেকেই শেরপুর ডিগ্রী কলেজে লেখাপড়া করতেন। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে আমি মকবুল ভাইয়ের সাথে পায়ে হেঁটে সিরাজগঞ্জের কড্ডা গ্রামে বেড়াতে যাই। পুর্বপুরুষদের গ্রামে গিয়ে সকলের সাথে মিলিত হতে পেরে বেশ আনন্দই লাগছিলো। জানুয়ারি মাসে তীব্র শীতের মধ্যেই প্রায় ১৫ দিন কড্ডা গ্রামে ছিলাম। সেখানে আব্দুল্লাহ সিদ্দিকী আব্দুল্লাহ চাচা,আব্দুল মান্নান সিদ্দিকী মান্নান চাচা, আব্দুল ওয়াদুদ সিদ্দিকী দুদু চাচা,জান্নাত আরা হেনরীর বাবা আব্দুল হামিদ সিদ্দিকী হামিদ চাচা, মনিরুজ্জামান সিদ্দিকী খোকা চাচা সহ পুর্বপুরুষদের অনেকের সাথেই দেখা সাক্ষাৎ হয়। তাদের বাড়িতেও আদর যতেœর কমতি ছিলোনা। মকবুল ভাইসহ সমবয়সী চাচাতো ভাইদের সাথে অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। ঐতিহাসিক কড়িগাছ, হুরাসাগর নদী, পোড়াবাড়ি বাজার, সয়দাবাদ সহ আশেপাশের বিভিন্ন গ্রামের তাঁতপল্লীতে তাঁতের খট খট শব্দ এখনও কানে বাজে। মকবুল ভাইয়ের আম্মা আমার চাচিআম্মার আদরযতেœর কথা আজও ভুলতে পারিনি। এবার বাড়ি ফেরার পালা, কিছু রাস্তা পায়ে হেঁটে কিছু রাস্তা গাড়িতে এভাবেই বাড়ি ফিরে আসি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগের জন্য দেশবাসির প্রতি আহবান জানালেন। স্কুল কলেজসহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হলো। প্রায় ১০ মাস বিরতির পর আমরা আবার স্কুলে যেতে শুরু করলাম। সবাইকে অটোপাশ দেওয়া হলো। আমি তখন অটোপাশ নিয়ে অষ্টম শ্রেনীতে উঠেছি। প্রায় ৩ মাইল রাস্তা পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। হটাৎ একদিন একটি বাস “বিসমিল্লাহ পরিবহন” রাস্তায় দেখতে পেলাম। মাঝে মধ্যে ঐ বাসে আমরা স্কুলে যাতায়াত করতাম। মির্জাপুর থেকে ছোনকা যেতে ছাত্রদের নিকট থেকে বাস ভাড়া নিতো দশ পয়সা।
মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্কুলে লেখাপড়া শুরু হলে একদিন আমার সহপাঠি ক্ষুদ্রবগুড়া গ্রামের তোজাম্মেল হক তোজাম আমাকে প্রস্তাব দিয়ে বললো যে আমিনপুর গ্রামের আজাহার আলী সরকারের ছেলে আবুল কালাম আজাদ তোমার সাথে বন্ধু পাততে চায়। আবুল কালাম আজাদ ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান। আমি কয়েকদিন পর তোজামের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম। এরপর একদিন স্কুলে মধ্যাহ্ন বিরতির সময় প্রধান শিক্ষকের অফিসের পাশে উন্মুক্ত চৌচালা ঘরের মধ্যে সহপাঠি রফিকুল ইসলাম বুলু,আবু বক্কার সিদ্দিক, আবুল হোসেন, আজগর আলী, ফজলুর রহমান, সোহরাফ হোসেন, আব্দুর রশিদসহ অনেকের উপস্থিতিতে তোজাম্মেল হক তোজাম আমার হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুলের সাথে কালামের কনিষ্ঠ আঙ্গুল মিলিয়ে বন্ধুত্ব করে দেয়। এরপর থেকে কালামের বাড়ীতে আমি এবং আমাদের বাড়িতে কালামের আসা যাওয়া শুরু হয়। আবুল কালাম আজাদ এর বাবা আজাহার আলী সরকার, ভগ্নিপতি রজিব উদ্দিন মাষ্টার, নওয়াব আলী মাষ্টার সহ তার প্রায় সকল আত্মীয় স্বজনের সাথে আমার নিবির সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৭৩ সালে আমি নবম শ্রেনীর ছাত্র। বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি আলহাজ¦ মজিবর রহমান মজনু তখন ছাত্রনেতা। তার হাত ধরেই রাজনীতিতে আমার হাতেখড়ি। একদিন তিনি আমাদের স্কুলে গিয়ে ছাত্রদের নিয়ে সভা করলেন। ঐ সভায় আমাকে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ছোনকা স্কুল শাখায় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবে মনোনীত করা হয়। ঐ বছর আমাদের ক্লাশের ভালো ভালো ছাত্ররা শেরপুর ডিজে হাইস্কুলসহ বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ভর্তি হয়। আমরা যারা অবশিষ্ট ছিলাম তাদেরকে নিয়ে হেডমাষ্টার মরহুম এন্তাজ আলী সহ অন্যান্য শিক্ষকরা চিন্তিত ছিলো। কারণ ভালো ভালো ছাত্ররা বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে ভর্তি হওয়ায় আমরা অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছাত্ররাই স্কুলে রইলাম। ১৯৭৪ সালে দশম শ্রেনীতে উত্তির্ণ হলাম। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে পাবলিক পরীক্ষায় নকল হলেও ১৯৭৪ সালে পাবলিক পরীক্ষা খুবই কড়াকড়ি শুরু হলো। পরীক্ষা হলে যেন ঘাড় ঘুড়ানোর কোন উপায় নেই। শিক্ষকরা আমাদের বিশেষ যতœ নিতে শুরু করলেন। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পরীক্ষা। আমি ও আমার বাল্যবন্ধু আবুল কালাম আজাদ শেরপুর শহরের শান্তিনগরে আমাদের বাসাতে থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দেই। হেডমাষ্টার মরহুম এন্তাজ আলী সাহেব প্রতিদিন আমাদের লেখাপড়ার খোঁজখবর নিতেন। পরীক্ষা শেষ হলে লেখাপড়ার চাপ কিছুটা কমলেও ফলাফলের চিন্তায় চোখে ঘুম আসতে চায়না। পরীক্ষার মাস দুয়েক পর হটাৎ একদিন বিকালে খবর পেলাম পরীক্ষার রেজাল্ট বের হয়েছে। আমিতো ভয়ে অস্থির। এদিকে আমার বাবা মুনসী আব্দুল মালেক রেজাল্টসহ মিষ্টি নিয়ে বাড়িতে ফিরলেন। আমার বাবা মায়ের সন্তানদের মধ্যে আমিই প্রথম একচান্সে এসএসসি (ম্যাট্রিক) পাশ করায় বাবা মা সহ সকলেই খুব খুশি হয়েছেন। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকরাও খুব খুশি হয়েছেন। আমরা ২৮ জন পরীক্ষার্থী একসাথে এসএসসি পরীক্ষা দিলেও আমিসহ এ্যাড: আবুল কালাম আজাদ, ব্যাংকার আমজাদ হোসেন, শিক্ষক ফজলুর রহমান,আব্দুর রশিদসহ মাত্র ৬ জন এসএসসি পাশ করি। (চলবে)

 

 

 

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close