স্থানীয় খবর

শেরপুরে অরক্ষিত বধ্যভূমি ও গণকবর বীর শহীদরা অবহেলা-অনাদরে!

Spread the love

ষ্টাফ রির্পোটার: স্বাধীনতার ৪৮বছর পার হলেও বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করা হয়নি। ফলে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদরা ঘুমিয়ে আছেন অবহেলা-অনাদরে!। এছাড়া স্বাধীনতার স্মৃতিতে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনাও বেহালদশায়। এ অবস্থায় শহীদদের গণকবর ও বধ্যভূমিগুলোর অস্তিত্ব বিলীনের পথে। এই উপজেলার পাঁচটি গণকবর ও বধ্যভূমি রয়েছে। এরমধ্যে একটি গণকবর সংরণের জন্য নিরাপত্তা প্রাচীর ও নামফলক স্থাপন ও আরেকটির স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রণাবেণের অভাবে এসবের অবস্থাও বেহাল। আর বাকি গণকবরগুলোর অবস্থা আরও করুন। অথচ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে উপজেলার দড়িমুকুন্দ, কল্যাণী, ঘোগা, গোপালপুর, বাগড়া কলোনিতে যে গণহত্যা ঘটনা ঘটেছে, তার বর্ণনা শুনে এখনো অনেকের গা শিউরে ওঠে।
দড়িমুকুন্দ গণকবর: ১৯৭১সালের ২৪এপ্রিল শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের দড়িমুকুন্দ গ্রামে পাকিস্তানী সেনারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায়। দিনটি ছিল ১৯৭১সালের ২৬ এপ্রিল। মাত্র ৭জন পাকিস্তানী মিলিটারী তাদের দড়িমুকুন্দ গ্রামে হানা দেয়। তারা গ্রামের লোকদের ডেকে নিয়ে গ্রামের প্রবেশ পথের দু’ধারে লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। একপর্যায়ে গুলি করে হত্যা করে ২৪জন স্বাধীনতাকামীকে। তারপর পেট্রোল দিয়ে জ্বালিয়ে দেয় গ্রামের প্রতিটি বাড়ি। নিমিষেই মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয় দড়িমুকুন্দ গ্রাম। পরে পাকসেনারা গ্রাম ছেড়ে চলে গেলে ভীত-সন্ত্রস্ত লোকজন গুলিতে নিহতদের ঘটনাস্থলের পাশেই কবর দিয়ে রাখেন। পরবর্তীতে ২০০২সালে ২৬মার্চ শেরপুর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সেখানে একটি নামফলক তৈরি করা হয়েছে।
বাগড়া কলোনি বধ্যভূমি: ১৯৭১সালের এপ্রিলের মাসের শেষদিকে উপজেলার কুসুম্বী ইউনিয়নের বাগড়া কলোনিতে পাকিস্তানী সেনারা আক্রমণ চালায়। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, গ্রামের লোকজন বাঙলার স্বাধীনতার পে মিছিল নিয়ে গ্রামের পাশের প্রধান সড়কে যান। এ দেশের রাজাকাররা এই খবর পাক সেনাদের কাছে পৌঁছে দেয়। তখন বেলা অনুমান সাড়ে ১০টা হবে। পাক সেনারা এসে মিছিলকারীদের ঘেরাও করে। পরে তাদের ধরে নিয়ে সেনারা মনছেরের ভাটায় যায়। ভাটার ভিতর তাঁদের লাইনে বসে দিয়ে মেশিনগানের গুলি চালায়। মুহুর্তেই ৩২জন স্বাধীনতাকামী লাশ হয়ে যান। এসময় বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। যে ইটের ভাটায় রাত দিন লেলিহান শিখার উদগীরণ হত, সেই ভাটা নিমিষেই শহীদদের রক্তে সিক্ত হলো। তপ্ত ইটগুলোর দীর্ঘদিনের তৃষ্ণা যেন পাক হায়েনারা মিটিয়ে দিল স্বাধীনতাকামী শহীদের রক্ত দিয়ে। পরে শহীদদের ১০-১২জনকে গ্রামের পূর্বপাশের একটি ভিটায় কবর দেওয়া হয়। এ স্থানটি বর্তমানে কয়েকটি তাল গাছ দিয়ে ঘেরা রয়েছে। এখানে আর ইট ভাটা নেই। কোনো নামফলক বা স্মৃতিসৌধ গড়ে ওঠেনি। অনেকেই জানে না এই বধ্যভূমির কথা।
ঘোগাব্রিজ ও গোপালপুর বধ্যভূমি (খাগা হিন্দুপাড়া): নিদিষ্ট দিন তারিখ জানা না গেলেও এপ্রিলের কোন এক দিন পাকসেনারা ঘোগাবিজ্র ও গোপালপুর এলাকায় ব্যাপক গণহত্যা চালায়। পাকসেনারা ঘোগাব্রিজ এলাকায় ৩০০জন ও গোপালপুর এলাকায় ১৮-২০জন স্বাধীনতাকামীকে হত্যা করে। সংরণের অভাবে স্বাধীনতার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সমৃদ্ধ স্থানগুলো বর্তমানে চেনার কোন উপায় নেই।
কল্যাণী গণকবর: ১৯৭১সালের মে মাসের প্রথম শুক্রবার রাজাকার-আলবদরদের সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী গ্রাম তিনদিক থেকে ঘিরে ফেলে। এরপর বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়ে ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। একইসঙ্গে নিরীহ গ্রামবাসীর ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেদিন পাক হানাদার বাহিনীর গুলিতে নিহত অনেকেরই নাম পরিচয় জানা না গেলেও যাদের পরিচয় মিলেছে তাঁরা হলেন- কল্যাণী গ্রামের রাধিকা পাল, বিরেণ পাল, ুদিরাম পাল, কৃষ্ণ লাল পাল, মতি লাল পাল, হারাণ পাল, ধলু পাল, শ্রীবাস শীল, চিত্ত পাল, ফুরিয়া পাল, শ্রীদীপ পাল, সুদেব পাল, জোগেশ্বর পাল, ন্যাড়া পাল, বিহারী পাল, মহিন্দ্র মোহন্ত পাল। স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৩ বছর পর সাপ্তাহিক আজকের শেরপুর পত্রিকার সম্পাদক মুনসী সাইফুল বারী ডাবলু’র প্রস্তাব ও জোরালো দাবির প্রেেিত ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে সেখানে প্রাথমিকভাবে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন উপজেলা প্রশাসন। কিন্তু এই স্মৃতিস্তম্ভটিও পড়ে আছে অযতœ আর অবহেলায়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিয়াকত আলী সেখ বলেন, গণকবরগুলোর সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে বধ্যভূমিগুলো আধুনিকায়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হবে বলেও এই কর্মকর্তা জানান।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close