দেশের খবর

মুজিববর্ষ ও জাতির জনকের সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন

Spread the love

মুনসী সাইফুল বারী ডাবলু
বাংলাদেশের ইতিহাসের অসংখ্য ঘটনার উজ্জ্বল সাক্ষী একাত্তরের অগ্নিঝরা মার্চ। এই মার্চ মাসের রক্তের স্রোতে ভেসেই এসেছে বাঙালির কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ পথ বেয়ে মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এক সাগর রক্তের বিনিময়ে এই অর্জন। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই মাস বাঙালির হƒদয়ে চিরজাগরূকÑচিরভাস্বর। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘ ২৪ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, শোষণ-বঞ্চনা, জেল-জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি। ওই সময়ের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলার অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে একক নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তৎকালীন পাকিস্তান জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের নেতা এবং পূর্ববাংলার গণমানুষের মুকুটহীন সম্রাট হিসেবে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেনÑ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসমুদ্রে ওই ঐতিহাসিক ঘোষণার আলোকে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু তার সাংবিধানিক অধিকার থেকেই ২৬ মার্চ মধ্যরাতে বিডিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বাঙালির শৌর্য-বীর্যের ইতিহাস হাজার বছরের। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে মীরজাফর গংয়ের ষড়যন্ত্র আর বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। পরাজয়ের গ্ল¬ানির ২১৪ বছর পর সেই সূর্যের রক্তিম আভা পুনরায় উদ্ভাসিত হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়েই। ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সভ্যতা, শিক্ষা, সামাজিকতা এবং মন-মানসিকতায় বাঙালি তথা পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সেই ১৪ শ’ মাইল দূরের ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষদের কর্তৃত্ব বাঙালি কোনদিনই মেনে নিতে পারেনি। তাই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর হিন্দু-মুসলমান দ্বি-জাতি তত্ত্বের উদ্ভট সংজ্ঞায় প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক দেশের যাত্রালগ্ন থেকেই শুরু হয় বাংলা ভাষার মর্যাদার লড়াই এবং বাঙালির স্বাধিকারের সংগ্রাম।
১৯৬৬ সালে বাঙালীর মুক্তি সনদ ছয় দফা পেশ করলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। এই ছয় দফা পশ্চিমা শাসক গোষ্টীর মাথায় যেন বজ্রাঘাত হানলো। ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান গর্জে উঠলেন বাঙ্গালী জাতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে। শুরু হলো আগর তলা ষড়যন্ত্র। কিন্তু আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে তুমুল আন্দোলন গড়ে তুললো ছাত্র সমাজ। গন আন্দোলন গন অভ্যূথানে রূপ নিল। ১৯৬৯ সালের ২৬ মার্চ আইয়ুব শাহীর পতনের পর জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক শাসন জারি করলেন। সেই সাথে ওয়াদা করলেন নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ব্যারাকে ফিরে যাবেন।
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর জাতীয় পরিষদ এবং ১৭ ডিসেম্বর প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরংকুশ সংখ্যা গরিষ্ট আসনে জয়লাভ করলো। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হলেন পাকিস্থানের একছত্র নির্বাচিত নেতা। আওয়ামী লীগের জয় মানেই বাংলার জয় বাঙালীর জয়। নির্বাচনের এই ফলাফল পশ্চিমা শাসক গোষ্টী মেনে নিতে পারেনি। তাই জঙ্গীশাহী ইয়াহীয়া খান তার জেনারেলদের সংগে নিয়ে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করলো। ক্ষমতা হস্তান্তর না করে নানা তাল বাহানা করতে থাকে। ১৯৭১-এর ২৩ মার্চ বাংলাদেশের দৃশ্যমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। কেননা এদিন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটি ঘরে ঘরে, অফিস-আদালতে উড়েছিল ঘন সবুজের মধ্যে রক্তলাল সূর্য ও বাংলাদেশের ভূখন্ড চিত্রিত এক পতাকা, যা ছিল জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, স্বপ্ন, সাহস আর দৃঢ় প্রত্যয়ের প্রতীক। সে দিনই আক্ষরিক অর্থে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে পাক হানাদার বাহিনী ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মানব ইতিহাসের যে জঘন্যতম হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, সেই পৈশাচিকতার ওপর ভর করেই ঘুরে দাঁড়ায় বাংলার অকুতোভয় দামাল সন্তানরা। অবস্থা টের পেয়ে বঙ্গবন্ধু মধ্যরাতে গ্রেফতারের আগেই সুকৌশলে ঘোষণা করেন ‘বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতা’। মুক্তির অদম্য স্পৃহায় উদ্দীপ্ত সমগ্র জাতি জীবন বাজি রেখে লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার সূত্র ধরে ষড়যন্ত্রের আভাস পেয়ে সমগ্র জাতি জোটবদ্ধ হয়ে প্রস্তুতি নেয় চূড়ান্ত যুদ্ধের। ঘরে ঘরে শুরু হয় প্রস্তুতি। বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে সারাদেশের জেলা, থানা, ইউনিয়ন ও পাড়া-মহল্লায় গঠিত হয় সংগ্রাম কমিটি। সংগ্রহ হতে থাকে অস্ত্র। চলতে থাকে প্রশিক্ষণ। গড়ে তোলা হয় সর্বত্র প্রতিরোধ ব্যূহ। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয় প্রবাসী মুজিবনগর সরকার। আর এই প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়েই বাঙালি জাতি অর্জন করে তার কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।
এরপর পেরিয়ে গেছে সুদীর্ঘ ৪৮ বছর। স্বাধীনতার এই ৪৮ বছরে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব কষছে জাতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাফল্যের খতিয়ান দীর্ঘ হলেও প্রত্যাশিত লক্ষ্যে এখনো পৌঁছুতে পারেনি বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাধীনতা বড় অর্জন হলেও যে সব লক্ষ্য, আদর্শকে সামনে রেখে নয়মাস যুদ্ধ করে বিজয় অর্জিত হয়েছিল সেসব লক্ষ্যের অনেক কিছুই এখনো পূরণ হয়নি। শিক্ষা, নারী আন্দোলন, মৌলবাদবিরোধী আন্দোলনে সাফল্য এলেও রাজনীতিতে কাক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। মুক্তি ঘটেনি অর্থনীতিতে। এখনো জাতির মাথায় রয়েছে যুদ্ধাপরাধের কলঙ্ক তিলক। ৪৮ বছর পরে স্বাধীনতার মূল চেতনায় দেশ, সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে সবচেয়ে বেশি অর্জন হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে। সাফল্যজনকভাবে বেড়েছে সাক্ষরতার হার। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা সর্বত্রই শিক্ষার্থীদের পদচারণা বেড়েছে। তবে বাড়েনি নৈতিক শিক্ষা। স্বাধীনতার অন্যতম অঙ্গীকার সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি আজো। স্বাধীনতার ৪৮ বছরে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে মুক্তি চান তরুণ প্রজন্ম। তাদের মতে,৪৮ বছরে শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ, নারী উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে রয়েছে বহু অভাবনীয় সাফল্য।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী শুরু হয়েছে। সরকার মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসুচী গ্রহন করলেও বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় কর্মসুচী সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। মুজিববর্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ খুব প্রয়োজন। জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্যে সন্ত্রাস জঙ্গীবাদ অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগনকে সচেতন করতে হবে। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে সমুন্নত রাখা, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন, কার্যকর জাতীয় সংসদ, শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানো, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধের চর্চা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বিমোচন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠা ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার দাবি জানিয়েছেন তরুণ প্রজন্ম। লেখক-সম্পাদক,সাপ্তাহিক আজকের শেরপুর পত্রিকা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Back to top button
Close